আরবের তৎকালীন অবস্থা

আরবের তৎকালীন অবস্থা

সামাজিক অবস্থা :
তৎকালীন আরব সমাজে বিভিন্ন শ্রেণীর লোকজন ববসাব করত। অবস্থা এবং অবস্থানের কথা বিবেচনা করলে লক্ষ্য করা যায় যে, জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে যথেষ্ট ভিন্নতা রয়েছে। অভিজাত শ্রেণীর পরিবারে পুরুষ এবং মহিলাগণের পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল মর্যাদা এবং ন্যায়-ভিত্তিক ব্যবস্থার উপর প্রতিষ্ঠিত। বহু ব্যাপারে মহিলাদের স্বাধীনতা দেয়া হতো, তাঁদের যুক্তি-সঙ্গত কথাবার্তার যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হতো এবং তাঁদের ব্যক্তি বৈশিষ্ট্যকে মর্যাদা দেয়া হতো। অভিজাত পরিবারের মহিলাদের রক্ষণাবেক্ষণ এবং মান সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখার ব্যাপারে সদা সতর্ক দৃষ্টি রাখা হতো। মহিলাদের মান মর্যাদার ব্যাপারে হানিকর বা অবমাননাকর পরিস্থিতিতে সঙ্গে সঙ্গে তলোয়ার কোষমুক্ত হয়ে খুন-খারাবি শুরু হয়ে যেত।

তৎকালীন আরবে প্রচলিত রেওয়াজ মাফিক কোন ব্যক্তি নিজের উদারতা কিংবা বীরত্বের প্রশংসাসূচক কোন কিছু বলতে চাইলে মহিলাদের সম্বোধন করেই তা বলা হতো। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মহিলারা ইচ্ছা করতে পারত। পক্ষান্তরে পুরুষদের উত্তেজিত ও উদ্বোধিত করে সহজেই যুদ্ধাগ্নিও প্রজ্জ্বলিত করে দিতে পারত।

কিন্তু এতসব সত্ত্বেও প্রকৃতপক্ষে পুরুষ প্রধান সমাজ কাঠামোই আরবে প্রচলিত ছিল। পরিবার প্রধান বা পরিবারের পরিচালক হিসেবে পুরুষদেরই প্রাধান্য ছিল এবং তাঁদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হিসেবে স্বীকৃত এবং গৃহীত হতো। পারিবারিক জীবন যাত্রার ক্ষেত্রে পুরুষ স্ত্রী এবং সম্পর্ক বিবাহ বন্ধনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হতো। বর-কনে উভয় পক্ষের অভিভাবকগণের সম্মতিক্রমে কনের অভিভাবকগণের তত্ত্বাবধানে বিবাহ পর্ব অনুষ্ঠিত হতো। অভিভাবকগণের অগোচরে ইচ্ছামাফিক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার অধিকার মহিলাদের ছিল না।

এক দিকে যখন সম্ভ্রান্ত এবং অভিজাত পরিবারসমূহের জন্য প্রচলিত ছিল এ ব্যবস্থা, অপরপক্ষে তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে নারী পুরুষের সম্পর্ক এবং মেলামেশার ক্ষেত্রে এমন সব ঘৃণ্য ব্যবস্থা এবং জঘন্য প্রথা প্রচলিত ছিল যাকে অশ্লীলতা, পাশবিকতা এবং ব্যভিচার ছাড়া অন্য কিছুই বলা যেতে পারে না। উম্মুল মুমিনীন আয়িশাহ (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত তথ্যাদি সূত্রে জানা যায় যে, অন্ধকারে যুগে আরব সমাজে বিবাহের চারটি প্রথা প্রচলিত ছিল। এর মধ্যে একটি হচ্ছে তো সেই প্রথা যা বর্তমান যুগেও জনসমাজে প্রচলিত রয়েছে। এ প্রথানুসারে বিভিন্ন দিক বিবেচনার পর একজন তাঁর অধীনস্থ মহিলার জন্য অন্য এক জনের নিকট বিয়ের প্রস্তাব বা পয়গাম পাঠাতেন। তারপর উভয় পক্ষের মধ্যে বোঝাপড়ার মাধ্যমে স্বীকৃতি লাভের পর বর কনেকে ধার্য মোহর দিয়ে বিয়ে করত।

নারী-পুরুষের মিলনের দ্বিতীয় প্রথাকে বলা হতো ‘নিকাহে ইসতিবযা’। নারী-পুরুষের মিলনের উদ্দেশ্য থাকত জ্ঞানী, গুণী ও শক্তিধর কোন সুপুরুষের সঙ্গে সঙ্গম ক্রিয়ায় লিপ্ত হওয়ার মাধ্যমে উৎকৃষ্ট শ্রেণীর সন্তান লাভ। এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে যখন কোন মহিলা ঋতু জনিত অপবিত্রতা থেকে পবিত্র হতেন তখন তাঁর স্বামী তাঁকে তাঁর পছন্দ মতো কোন সুপুরুষের সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য প্রস্তাব পাঠাতে বলতেন। এ অবস্থায় স্বামী তাঁর নিকট থেকে পৃথক হয়ে থাকতেন, কোন ক্রমেই তাঁর সঙ্গে সঙ্গম ক্রিয়ায় লিপ্ত হতেন না। এদিকে স্ত্রী প্রেরিত প্রস্তাব স্বীকৃতি লাভ করলে গর্ভ ধারণের সুস্পষ্ট আলামত প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত তার সঙ্গে সঙ্গম ক্রিয়ায় লিপ্ত হতে থাকতেন। তারপর গর্ভ ধারণের আলামত সুস্পষ্ট হলে তিনি তাঁর স্বামীর সঙ্গে মিলিত হতেন। হিন্দুস্থানী পরিভাষায় এ বিবাহকে ‘নিয়োগ’ বলা হয়।

তথাকথিত ‘বিবাহ’ নামক নারী-পুরুষের মিলনের তৃতীয় প্রথা ভিন্নতর রূপের একটি জঘণ্য ব্যাপার। এতে দশ থেকে কম সংখ্যক ব্যক্তির সমন্বয়ে একটি দল একত্রিত হতো এবং সকলে পর্যায়ক্রমে একই মহিলার সঙ্গে সঙ্গম ক্রিয়ায় লিপ্ত হতো। এর ফলে এ মহিলা গর্ভ ধারণের পর যথা সময়ে সন্তান প্রসব করত। সন্তান প্রসবের কয়েক দিন পর সেই মহিলা তাঁর সঙ্গে যাঁরা সঙ্গম ক্রিয়ায় লিপ্ত হয়েছিলেন তাঁদের সকলকে ডেকে নিয়ে একত্রিত করতেন। প্রচলিত প্রথায় বাধ্য হয়েই সংশি­ষ্ট সকলকে সেখানে উপস্থিত হতে হতো। সেখানে উপস্থিত হওয়ার ব্যাপারে অমত করার কোন উপায় থাকতনা। মহিলার আহবানে যখন সকলে উপস্থিত হতেন তখন সকলকে লক্ষ্য করে মহিলা বলতেন যে, ‘আপনাদের সঙ্গে সঙ্গম ক্রিয়ার ফলেই যে আমার এ সন্তান ভূমিষ্ট হয়েছে এ ব্যাপারটি আপনারা সকলেই অবগত আছেন।’

তারপর সমবেত লোকজনদের মথ্য থেকে এক জনকে লক্ষ্য করে বলতেন ‘হে অমুক, আমার গর্ভজাত এ সন্তান হচ্ছে আপনারই সন্তান।’ মহিলার ঘোষণাক্রমে সন্তানটি হতো তাঁরই সন্তান এবং সংশি­ষ্ট সকলেই এর স্বীকৃতি প্রদান করতে বাধ্য থাকতেন।

নারী-পুরুষের ‘বিবাহ ও মিলন’ নাম দিয়ে আরও একটি জঘন্য রকমের অশ্ল­ীল রেওয়াজ জাহেলিয়াত যুগের আরব সমাজে প্রচলিত ছিল। এতে কোন মহিলাকে কেন্দ্র করে বহু লোক একত্রিত হতেন এবং পর্যায়ক্রমে তাঁর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতেন। এরা হচ্ছেন পতিতা প্রবৃত্তির পেশাবলম্বিনী মহিলা। কাজেই, যৌন সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্যে কোন লোক তাঁদের নিকট আগমন করলে তাঁরা আপত্তি করতেন না। এদের বাড়ির প্রবেশ দ্বারে পেশার প্রতীক হিসেবে নিশান দিয়ে রাখা হতো যাতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা নির্দ্বিধায় গমনাগমন করতে পারেন। যৌনক্রিয়ার ফলে গর্ভ ধারণের পর যখন কোন মহিলা সন্তান প্রসব করতেন তখন তাঁর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনকারী সকল পুরুষকে একত্রিত করা হতো। তারপর যে ব্যক্তি মানুষের অবয়ব প্রত্যক্ষ করে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম এমন ব্যক্তিকে সেখানে আহবান জানানো হতো। সেই ব্যক্তি উপস্থিত সকলের অবয়ব নিরীক্ষণান্তে তাঁর বিবেচনা মতো এক জনের সঙ্গে সন্তানপির যোগসূত্র বা সম্পর্ক স্থাপন করে দিতেন। তিনি বলতেন, ‘এ সন্তান আপনার’’। যাঁকে লক্ষ্য করে এ রায় দেয়া হতো তিনি তা মানতে বাধ্য থাকতেন। এভাবে নব জাতকটির একজন পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক যুক্ত হয়ে যেত। তিনিও শিশুটিকে তাঁর ঔরসজাত সন্তান বলেই মনে করতেন।

যখন আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে রাসূল রূপে প্রেরণ করলেন তখন জাহেলিয়াত যুগের সর্ব প্রকার অশ্লীল বৈবাহিক ব্যবস্থার অবসান ঘটল। বর্তমানে ইসলামী সমাজে যে বিবাহ প্রথা প্রচলিত রয়েছে আল্লাহ তা‘আলার নির্দেশে রাসূলে কারীম (সাঃ) আরব সমাজে সেই ব্যবস্থাই প্রতিষ্ঠিত করেন।[1]

আরও কোন কোন ক্ষেত্রে আরবের নারী-পুরুষদের অন্য রকম সম্পর্কের কথা জানা যায়। তৎকালে, অর্থাৎ জাহেলিয়াত আমলে নারী-পুরুষ সম্পর্ক বন্ধনের ব্যাপারটি এমন প্রথার উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল যা তলোয়ারের ধার এবং বল্ল­মের ফলার সাহায্যে প্রতিষ্ঠালাভ করত। এতে গোত্রীয় যুদ্ধ বিগ্রহের ক্ষেত্রে বিজয়ী গোত্র বিজিত গোত্রের নারীদের আটক রেখে যৌন সম্ভোগে তাদের ব্যবহার করত। এ সকল মহিলার গর্ভে যে সকল সন্তান জন্মলাভ করত তাদের কোন সামাজিক মর্যাদা দেয়া হতো না। সামাজিক দৃষ্টিকোন থেকে সারা জীবন তাদেরকে খাটো হয়েই থাকতে হতো।

জাহেলিয়াত আমলে একই সঙ্গে একাধিক অনির্দিষ্ট সংখ্যক স্ত্রী গ্রহণের রেওয়াজ প্রচলিত ছিল। একই সঙ্গে দু’সহোদরাকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করে সংসার করাটা কোন দোষের ব্যাপার ছিল না। পিতার মৃত্যুর পর এবং পিতা কর্তৃক তালাক প্রাপ্তা বিমাতাকে বিবাহ প্রথাও তৎকালে চালু ছিল।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

‏{‏وَلاَ تَنكِحُوْا مَا نَكَحَ آبَاؤُكُم مِّنَ النِّسَاء إِلاَّ مَا قَدْ سَلَفَ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَمَقْتًا وَسَاء سَبِيْلاً حُرِّمَتْ عَلَيْكُمْ أُمَّهَاتُكُمْ وَبَنَاتُكُمْ وَأَخَوَاتُكُمْ وَعَمَّاتُكُمْ وَخَالاَتُكُمْ وَبَنَاتُ الأَخِ وَبَنَاتُ الأُخْتِ وَأُمَّهَاتُكُمُاللاَّتِيْ أَرْضَعْنَكُمْ وَأَخَوَاتُكُم مِّنَ الرَّضَاعَةِ وَأُمَّهَاتُ نِسَآئِكُمْ وَرَبَائِبُكُمُ اللاَّتِيْ فِيْ حُجُوْرِكُم مِّن نِّسَآئِكُمُ اللاَّتِيْ دَخَلْتُم بِهِنَّ فَإِن لَّمْ تَكُوْنُوْا دَخَلْتُم بِهِنَّ فَلاَ جُنَاحَ عَلَيْكُمْ وَحَلاَئِلُ أَبْنَائِكُمُ الَّذِيْنَ مِنْأَصْلاَبِكُمْ وَأَن تَجْمَعُوْا بَيْنَ الأُخْتَيْنِ إَلاَّ مَا قَدْ سَلَفَ إِنَّ اللهَ كَانَ غَفُوْرًا رَّحِيْمًا‏}‏ ‏[‏سورة النساء‏:‏ 22، 233]

‘যাদেরকে তোমাদের পিতৃপুরুষ বিয়ে করেছে, সেসব নারীকে বিয়ে করো না, পূর্বে যা হয়ে গেছে হয়ে গেছে, নিশ্চয়ই তা অশ্লীল, অতি ঘৃণ্য ও নিকৃষ্ট পন্থা। – তোমাদের প্রতি হারাম করা হয়েছে তোমাদের মা এবং মেয়ে, বোন, ফুফু, খালা, ভাইঝি, ভাগিনী, দুধ মা, দুধ বোন, শ্বাশুড়ী, তোমাদের স্ত্রীদের মধ্যে যার সাথে সঙ্গত হয়েছ তার পূর্ব স্বামীর ঔরসজাত মেয়ে যারা তোমাদের তত্ত্বাবধানে আছে, কিন্তু যদি তাদের সাথে তোমরা সহবাস না করে থাক, তবে (তাদের বদলে তাদের মেয়েদেরকে বিয়ে করলে) তোমাদের প্রতি গুনাহ নেই এবং (তোমাদের প্রতি হারাম করা হয়েছে) তোমাদের ঔরসজাত পুত্রের স্ত্রী এবং এক সঙ্গে দু’ বোনকে (বিবাহ বন্ধনে) রাখা, পূর্বে যা হয়ে গেছে হয়ে গেছে, নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, দয়ালু।’ (আন-নিসা ৪ : ২২-২৩)

স্ত্রীকে পুরুষদের তালাক প্রদানের অধিকার ছিল কিন্তু এ ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোন সময় সীমা ছিল না অতঃপর ইসলাম তা নির্দিষ্ট করে দেয়।[2]

সেই আমলে ব্যভিচারের মতো একটি অতি ঘৃণ্য ও জঘন্য পাপাচারে লিপ্ত হতে প্রায় সকল শ্রেণীর মানুষকেই দেখা যেত। কোন গোষ্ঠী কিংবা গোত্রের খুব নগণ্য সংখ্যক লোকই এ নারকীয় দুষ্কর্ম থেকে মুক্ত থাকত। অবশ্য এমন কিছু সংখ্যক নারী-পুরুষও চোখে পড়ত যাঁদের আভিজাত্যানুভূতি ও সম্ভ্রম বোধ পাপাচারের এ পঙ্কিলতা থেকে তাঁদেরকে বিরত রাখত। অত্যন্ত দুঃসহ অবস্থার মধ্য দিয়ে নারীদের জীবন যাপন করতে হতো। অবশ্য দাসীদের তুলনায় স্বাধীনাদের অবস্থা কিছুটা ভালো ছিল।

সমাজে দাসীগণকে অত্যন্ত দুঃসহ অবস্থার মধ্য দিয়ে কালাতিপাত করতে হতো। তৎকালীন সমাজে এমন মনিবের সংখ্যা খুব কমই ছিল যিনি দাসীদের নিয়ে নানা অনাচার, যথেচ্ছাচার ও পাপাচারে লিপ্ত না হতেন। এ সব অনাচার ও পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার ব্যাপারে কোন লজ্জাবোধ কিংবা সংশয়ের সৃষ্টি হতো না। যেমন ‘সুনানে আবূ দাউদ’ গ্রন্থে বর্ণিত আছে এক দফা এক ব্যক্তি খাড়া হয়ে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে লক্ষ্য করে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ), অমুক ব্যক্তি আমার পুত্র। অজ্ঞতার যুগে আমি তার মার সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছিলাম।

প্রত্যুত্তরে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, ‘ইসলামে এমন দাবীর কোন সুযোগ কিংবা মূল্য নেই। অন্ধকার যুগের যাবতীয় প্রথা পদদলিত ও বিলুপ্ত হয়েছে। এখন পুত্র তাঁরই গণ্য হবে যার স্ত্রী আছে অথবা দাসী আছে। আর ব্যভিচারীর জন্য রয়েছে পাথর।

সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস (রাঃ) এবং আবদ ইবনে যাম’আহর মধ্যে যাম’আহর দাসী পুত্র আব্দুর রহমান বিন যাম’আহর ব্যাপারে যে বিবাদ সংঘটিত হয় তা হচ্ছে একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা এবং এ ব্যাপারটি অবশ্যই অনেকের জানা কথা।[3]

অন্ধকার যুগে পিতা পুত্রের সম্পর্কও বিভিন্ন প্রকারের ছিল। সে সম্পর্কে ইতোপূর্বে কিছু কিছু আলোচিত হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এমনটি হয়তো বা বলা সঙ্গত হবে না যে সন্তান বাৎসল্যের ব্যাপারে তাদের কিছুটা ঘাটতি ছিল। নীচের কবিতার চরণটি প্রণিধানযোগ্যঃ

إنمـــا أولادنـــا بيننــا ** أكبادنا تمشـى على الأرض

‘‘আমাদের সন্তান আমাদের কলিজার টুকরো, যারা জমিনের উপর চলাফেরা করছে।’

পক্ষান্তরে, কন্যা সন্তানদের ব্যাপারে নারকীয় দুষ্কর্ম করতে তাঁরা একটুও দ্বিধাবোধ করতেন না। সমাজের লোক লজ্জা ও নিন্দা এবং তাঁদের জন্য ব্যয় নির্বাহের ভয়ে অনটন ও অনাহার এবং দুর্ভিক্ষের কারণে পুত্র সন্তানদেরও হত্যা করতেও তাঁরা কুণ্ঠা বোধ করতেন না।

আল-কুরআনে বর্ণিত হয়েছে :

‏‏‏{‏قُلْ تَعَالَوْاْ أَتْلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمْ عَلَيْكُمْ أَلاَّ تُشْرِكُوْا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَلاَ تَقْتُلُوْا أَوْلاَدَكُم مِّنْ إمْلاَقٍ نَّحْنُ نَرْزُقُكُمْ وَإِيَّاهُمْ وَلاَ تَقْرَبُوْا الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَلاَ تَقْتُلُوْا النَّفْسَ الَّتِيْحَرَّمَ اللهُ إِلاَّ بِالْحَقِّ ذَلِكُمْ وَصَّاكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُوْنَ‏}‏ ‏[‏الأنعام‏:‏ 151‏]‏

‘‘বল, ‘এসো, তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্য যা নিষিদ্ধ করেছেন তা পড়ে শোনাই, তা হচ্ছে, তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না, পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার কর, দরিদ্রতার ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না, আমিই তোমাদেরকে আর তাদেরকে জীবিকা দিয়ে থাকি, প্রকাশ্য বা গোপন কোন অশ্লীলতার কাছেও যেয়ো না, ন্যায়সঙ্গত কারণ ছাড়া কাউকে হত্যা করো না। এ সম্পর্কে তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যাতে তোমরা চিন্তা-ভাবনা করে কাজ কর।’ (আল-আন‘আম ৬ : ১৫১)[4]

কিন্তু পুত্র সন্তান হত্যার ব্যাপারে যে জনশ্রুতি রয়েছে তার যথার্থতা নির্ণয় করা বা প্রত্যয়ণ করা একটি অত্যন্ত মুস্কিল ব্যাপার। কারণ, গোত্রীয় বিরোধ এবং যুদ্ধবিগ্রহের সময় স্বপক্ষকে শক্তিশালী করা এবং যুদ্ধে জয়লাভ করার ব্যাপারে অন্যদের তুলনায় আপন আপন সন্তানেরাই অধিকতর নির্ভরযোগ্য বলে প্রামাণিত হতো। এ প্রেক্ষিতে পুত্র সন্তানগণের সংখ্যাধিক্যই আরববাসীগণের কাম্য হওয়া স্বাভাবিক।

অবশ্য এ জনশ্রুতিটি যে কোন ঐতিহাসিক সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত নয় এমনটি বলাও বোধ হয় সমীচীন হবে না। কারণ, ক্ষমতালিপ্সা, গোত্রপতিগণের জন্য পুত্র সন্তানগণের সংখ্যাধিক্য কাম্য হতে পারে। কিন্তু অনাহারী, অর্ধাহারী, নিরীহ গোবেচারা গরীব দুঃখীদের জন্য পুত্র সন্তানের আধিক্য কোন ক্রমেই কাম্য হতে পারে না। এরূপ ক্ষেত্রে দুর্ভিক্ষ কিংবা দুঃসময়ে পুত্র সন্তান হত্যার ব্যাপারটিকে একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না।

যতদূর জানা যায় তৎকালীন আরব সমাজে সহোদর ভাই, চাচাতো ভাই এবং গোষ্ঠী ও গোত্রের লোকজনদের পারস্পরিক সম্পর্কের ব্যাপারটি ছিল অত্যন্ত শক্ত ও মজবুত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। এর কারণ হচ্ছে, বহু গোত্রে বিভক্ত এবং গোত্রে গোত্রে রেষারেষিক্লীষ্ট আরব সমাজে গোত্রীয় ঐক্যের সুদৃঢ় বন্ধনের উপর নির্ভর করেই টিকে থাকতে হতো আরববাসীগণকে। গোত্রের মান-মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষার ব্যাপারে জীবন উৎসর্গ করতেও তাঁরা কুণ্ঠিত হতেন না। গোত্র সমূহের অভ্যন্তরে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিকতার মূলতত্ত্ব গোত্রীয় চেতনা এবং আবেগ ও অনুভূতিকে সজীব ও সক্রিয় রাখার ব্যাপারে সহায়ক হতো। সাম্প্রদায়িকতা এবং আত্মীয়তাই ছিল গোত্রীয় নিয়ম-শৃঙ্খলার উৎস। তাঁরা সেই উদাহরণকে শাব্দিক অর্থে বাস্তবে রূপদান করতেন, যেমনঃ

‏(‏اُنْصُرْ أَخَاكَ ظَالِمًا أَوْ مَظْلُوْمًا‏)‏

(নিজ ভাইকে সাহায্য কর সে অত্যাচারী হোক কিংবা অত্যাচারিত হোক)।

ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বিভিন্ন গোত্রের লোকজনের মধ্যে উৎকট এ গোত্রীয় চিন্তাধারা প্রচলিত ছিল। ইসলাম সেই সকল ধারণার মূলোৎপাটন করেছে। অত্যাচারী এবং অত্যাচারিত উভয়কেই সাহায্য করার বিধান ইসলামে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে অত্যাচারীকে সাহায্য করার অর্থ হল তাঁকে অন্যায় ও অনাচার থেকে বিরত রাখা। অবশ্য, মর্যাদা এবং নেতৃত্ব কর্তৃত্বের ব্যাপারে একে অন্যের আগে অগ্রসর হওয়ার যে আকুতি ও আকঙ্খা একই ব্যক্তি কর্তৃক বহুবার তা বাস্তবে পরিণত করতে চাওয়ার কারণেই গোত্র সমূহের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহের দামামা বেজে উঠত। আওস ও খাযরাজ, আবস ও যুবইয়ান, বাকর ও তগলিব এবং অন্যান্য গোত্রের সংঘটিত ঘটনাবলীর ক্ষেত্রে যেমনটি লক্ষ্য করা যায়।

পক্ষান্তরে যতদূর জানা যায়, বিভিন্ন গোত্র বা গোষ্ঠির পারস্পরিক সম্পর্কের ব্যাপারটি ছিল অপেক্ষাকৃত শিথিল বন্ধনের উপর প্রতিষ্ঠিত। প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন গোত্রের সকল ক্ষমতাই ব্যয়িত হতো পরস্পর পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহে। তবে দ্বীনী ব্যবস্থা এবং অশ্ল­ীল কথনের সংমিশ্রণে গঠিত কতিপয় রীতিনীতি ও অভ্যাসের মাধ্যমে কোন কোন ক্ষেত্রে পারস্পরিক লেনদেন, সহযোগিতামূলক কাজকর্ম সংক্রান্ত চুক্তি, প্রতিজ্ঞাপত্র এবং আনুগত্যের বিধি বিধান সমন্বিত ব্যবস্থাধীনে গোত্রগুলো পরস্পর একত্রিত হতেন। সর্বোপরি, হারাম মাসগুলো তাঁদের জীবিকার্জন ও জীবন নির্বাহের ব্যাপারে বিশেষভাবে সহায়ক ছিল। এ মাসগুলোতে তারা পরিপূর্ণ নিরাপত্তা দিত কেননা এ মাসগুলোকে তারা অত্যন্ত মর্যাদা প্রদান করতো। যেমন আবূ রযা ‘উতারিদী বলেন, যখন রজব মাস সমাগত হতো তখন আমরা বলতাম, منصل الأسنة তখন এমন কোন তীর বা বর্শা থাকতো না যা অকার্যকর করার জন্য তা থেকে আমরা লোহার ফলক খুলে ফেলতাম না এবং রজব মাসে আমরা এগুলো দূরে নিক্ষেপ করতাম। অন্যান্য হারাম মাসগুলোতেও একই অবস্থা বিরাজ করতো।

জাহেলিয়াত যুগের আরব সমাজের সামাজিক অবস্থার সারকথা বলতে গেলে শুধু এটুকুই বলতে হয় যে স্থিরতা এবং কুপমন্ডুকতাই সমাজ জীবনের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য। অজ্ঞতা, অশ্লীলতা, স্বেচ্ছাচারিতা ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ছিল সমগ্র সমাজ। অসত্য ও অন্যায়ের নিকট সত্য ও ন্যায় হয়ে পড়েছিল সম্পূর্ণরূপে পর্যুদস্ত। সাধারণ মানুষকে জীবন যাপন করতে হতো পশুর মত। বাজারের পণ্যের মতো ক্রয়-বিক্রয় করা হতো মহিলাদের এবং কোন কোন ক্ষেত্রে তাঁদের সঙ্গে ব্যবহার করা হতো মাটি ও পাথরের মতো। গোত্র কিংবা রাষ্ট্র যাই বলা হোক না কেন, প্রশাসনের মূল ভিত্তি ছিল শক্তিমত্ততা। প্রশাসন পরিচালিত হতো শক্তিধরগণের স্বার্থে। দুর্বলতর শ্রেণীর সাধারণ লোকজনের কল্যাণের কথা কস্মিনকালেও চিন্তা করা হতো না। প্রজাদের নিকট থেকে গৃহীত অর্থসম্পদে কোষাগার ভরে তোলা হতো এবং প্রতিদ্বন্দ্বীগণের বিরুদ্ধে সৈন্যদলের মহড়া এবং যুদ্ধবিগ্রহের উদ্দেশ্যেই তা সংরক্ষিত হতো।

ফুটনোটঃ[1] সহীহুল বুখারী, ‘অভিভাবক ছাড়া বিবাহ হবে না’’ অধ্যায় ২য় খন্ড ৭৬৯ পৃঃ এবং আবূ দাউদ, নেকাহর পদ্ধতিসমূহ অধ্যায়।

[2] আবূ দাউদ মুরাযায়াত বাদা ত্বাতালিকাতিস সালাম ৬৫ পৃঃ ‘আত্তালাকু মার্রতানে’’ সংশি­ষ্ট তাফসীর গ্রন্থ দ্রষ্টব্য।

[3] সহীহুল বুখারী ২য় খন্ড ৯৯৯, ১০৬৫ পৃঃ, আবূ দাউদ ‘আল আওলাদুলিল ফিরাশ’’ অধ্যায় দ্রষ্টব্য।

[4] কুরআন মাজীদ : ১৬/৫৮, ৫৯, ১৭/৩১, ৮১।

অর্থনৈতিক অবস্থাঃ
জাহেলিয়াত যুগের অর্থনৈতিক পরিকাঠামো এবং অর্থনৈতিক অবস্থা ও ব্যবস্থাকে কোনক্রমেই সামাজিক অবস্থার চাইতে উন্নত বলা যেতে পারে না। প্রকৃতপক্ষে তেজারত ব্যবসা-বাণিজ্যই ছিল আরব অধিবাসীগণের জীবন ও জীবিকার প্রধান অবলম্বন। কিন্তু দেশ থেকে দেশান্তরে গমনাগমন, মালপত্র পরিবহন, বাণিজ্যে উদ্দেশে ভ্রমণ পর্যটনের জন্য নিরাপত্তা ও শান্তি-শৃঙ্খলা ইত্যাদি ব্যাপারগুলো এতই সমস্যা সংকুল ছিল যে, নির্বিঘ্নে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করা ছিল এক দুষ্কর ব্যাপার। তৎকালে মরুপথে গমনাগমন এবং মালপত্র পরিবহনের একমাত্র মাধ্যম ছিল উট। উটের পিঠে চড়ে যাতায়াত এবং মালপত্র পরিবহনের ব্যবস্থাটি ছিল অত্যান্ত সময়-সাপেক্ষ ব্যাপার। তাছাড়া, পথও ছিল অত্যন্ত বিপদসংকুল। সব দিক দিয়ে সুসজ্জিত বড় বড় কাফেলা ছাড়া পথ চলার কথা চিন্তাই করা যেত না। কিন্তু তা সত্ত্বেও যে কোন সময় দস্যুদল কর্তৃক আক্রান্ত এবং যথা-সর্বস্ব লুণ্ঠিত হওয়ার ভয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে থাকতে হতো কাফেলার সকলকে। অবশ্য, হারাম মাসগুলোতে তাঁরা কিছুটা নির্ভয়ে ও নির্বিঘ্নে ব্যবসা-বাণিজ্যের কাজকর্ম চালিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু তা ছিল সময়ের একটি সীমিত পরিসরে সীমাবদ্ধ। কাজেই, বাণিজ্য-নির্ভর হলেও নানাবিধ কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য তাঁরা তেমন সুবিধা করতে পারতেন না। তবে হারাম মাসগুলোতে ‘উকায, যুল মাজায, মাজান্নাহ এবং আরও কিছু প্রসিদ্ধ মেলায় বেচা-কেনা করে তাঁরা কিছুটা পুষিয়ে নিতে পারতেন।’

আরব ভূখন্ডে শিল্পের প্রচলন তেমন এতটা ছিল না। শিল্প কারখানার ব্যাপারে পৃথিবীর অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় আরব দেশ আজও পিছনে পড়ে রয়েছে তুলনামূলকভাবে, সেকালে আরও অনেক বেশী পিছনে পড়ে ছিল। শিল্পের মধ্যে বস্ত্র, চর্ম শিল্প, ধাতব শিল্প, ইত্যাদি শিল্পের প্রচলন চোখে পড়ত। অবশ্য, এ শিল্পগুলো ইয়ামান, হীরা এবং শামরাজ্যের সন্নিকটস্থ অঞ্চলগুলোতেই প্রসার লাভ করেছিল অপেক্ষাকৃত বেশী। কিন্তু সুতোকাটার কাজে সকল অঞ্চলের মহিলাদেরই ব্যাপৃত থাকতে দেখা যেত। আরব ভূখন্ডে অভ্যন্তর ভাগের লোকেরা প্রায় সকলেই পশু পালন কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করত। মরু প্রান্তরের আনাচে-কানাচে যে সকল স্থানে কৃষির উপযোগী ভূমি পাওয়া যেত সে সকল স্থানে কৃষির ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে সমস্যাটি সব চাইতে জটিল ছিল তা হচ্ছে, মানুষের দারিদ্র দূরীকরণ এর মাধ্যম জীবনমান উন্নয়ন, মহামারী ও বোগব্যাধি দূরীকরণ কিংবা অন্য কোন কল্যাণমূলক কাজে অর্থ-সম্পদের খুব সামান্য অংশই ব্যয়িত হতো। সম্পদের সিংহ ভাগই ব্যয়িত হতো যুদ্ধবিগ্রহের কাজে। কাজেই, জনজীবনে সুখ, শান্তি বা স্বাচ্ছন্দ্য বলতে তেমন কিছুই ছিল না। সমাজে এমন এক শ্রেণীর লোক ছিল যাদের দুবেলা দু মুঠো অন্ন এবং দেহাবরণের জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় বস্ত্রখন্ডের সংস্থানও সম্ভব হতো না।

নীতি-নৈতিকতা :
মরুচারী আরববাসীগণের নীতি-নৈতিকতা ও চরিত্রের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী দুইটি ধারার বিকাশ লক্ষ্য করা যায়। এক দিকে লক্ষ্য করা যায় জুয়া, মদ্যপান, ব্যভিচার, হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি, হত্যা, প্রতিহিংসা পরায়ণতা ইত্যাদি জঘন্য মানবেতর ক্রিয়াকলাপ, অন্যদিকে লক্ষ্য করা যায় দয়া-দাক্ষিণ্য, উদারতা, অতিথিপরায়ণতা প্রতিজ্ঞাপরায়ণতা এবং আরও অনেক উন্নত মানসিক গুণাবলীর সমাবেশ। তাঁদের মানবেতর ক্রিয়াকলাপ এবং আচরণ সম্পর্কে ইতোপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। এ পর্যায়ে তাঁদের চরিত্রের বিভিন্ন মানবিক দিক এবং সমস্ত গুণাবলী সম্পর্কে আলোচনা করা হলঃ

১. দয়া-দাক্ষিণ্য ও উদারতাঃ অন্ধকার যুগের আরববাসীগণের দয়া-দাক্ষিণ্য সম্পর্কিত জনশ্রুতি ছিল সর্ব যুগের মানুষের গর্ব করার মতো একটি বিষয়। নীতি- নৈতিকতার ক্ষেত্রে ভ্রষ্টতার নিম্নতম পর্যায়ে পৌঁছলেও দয়া-দাক্ষিণ্য কিংবা বদান্যতার ব্যাপারে বিশ্ব মানব গোষ্ঠীর মধ্যে তাঁরা ছিলেন সকলের শীর্ষস্থানে। শুধু তাই নয় এ নিয়ে তাঁদের রীতিমত প্রতিযোগিতা চলতো এবং এ ব্যাপারে তাঁরা এ বলে গর্ব করতেন যে, ‘আরবের অর্ধভাগ তার জন্য উপহার হয়ে গিয়েছে।’ এ গুণকে কেন্দ্র করে কেউ কেউ নিজের প্রশংসা নিজেই করেছে আবার কেউ করেছে অন্যের প্রশংসা।

তাঁদের বদান্যতা বাস্তবিক পক্ষে এতই উঁচু মানের ছিল যে তা মানুষকে বিস্ময়ে অভিভূত করে ফেলে। কোন কোন ক্ষেত্রে এমনটিও দেখা গিয়েছে যে, কঠিন শীত কিংবা ক্ষুধার সময়ও কারো বাড়িতে যদি মেহমান আসতেন এবং তাঁর জীবন ও জীবিকার জন্য অপরিহার্যরূপে প্রয়োজনীয় একটি উট ছাড়া আর কোন সম্বলই নেই, তবুও এমন এক সংকটময় মুহূর্তেও তাঁর উদারতা এবং অতিথিপরায়ণতা তাঁকে এতটা প্রভাবিত করে ফেলত যে, অগ্র-পশ্চাৎ চিন্তা না করে তৎক্ষনাৎ সেই উটটি জবেহ করে মেহমানের মেহামান দারিত্বে তিনি লিপ্ত হয়ে পড়তেন। অধিকন্তু, তাঁদের দয়া-দাক্ষিণ্য এবং উদারতার অন্যন্য চেতনায় তারা বড় বড় শোনিত পাতের মূলসূত্র কিংবা তদ্সংক্রান্ত আর্থিক দায়-দায়িত্ব অবলীলাক্রমে আপন স্কন্ধে তুলে নিয়ে এমনভাবে মানুষকে ধ্বংস ও রক্তপাতের বিভীষিকা থেকে রক্ষা করত যে অন্যান্য নেতা কিংবা দলপতিগণের তুলনায় তা অনেক বেশী গর্বের ব্যাপারে হয়ে দাঁড়াত।

এ প্রসঙ্গে একটি মজার ব্যাপার ছিল, দয়া-দাক্ষিণ্যের অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করে তাঁরা যেমন গর্ববোধ করতেন তেমনি মদ্যপান করেও গর্ববোধ করতেন। মদ্যপান একটি গর্বের বিষয় সেই অর্থে মদ্যপান করে তাঁরা গর্ববোধ করতেন না, বরং এ জন্য গর্ববোধ করতেন যে, উদারতার উদবোধক হিসেবে তাদের উপর বিশেষভাবে প্রাধান্য বিস্তার করত যার ফলশ্রুতিতে কোন ত্যাগ স্বীকারকেই তাঁরা বড় মনে করতেন না। এর প্রকৃত কারণ হচ্ছে, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় মানুষ অসাধ্য সাধন করতে পিছপা হয় না। এজন্য এরা আঙ্গুর ফলের বৃক্ষকে ‘কারম’ এবং আঙ্গুর রসে তৈরি মদ্যকে ‘বিনতুল কারম’ (কারমের কন্যা) বলতেন। জাহেলিয়াত যুগের কবিগণের কাব্যে এ জাতীয় প্রশংসা এবং গৌরবসূচক রচনা একটি উল্লেখযোগ্য স্থান অধিকার করে রয়েছে। আনতার বিন সাদ্দাদ আবসী তাঁর নিজ মুয়াল্লাকায় বলেছেনঃ

অর্থঃ ‘নিদাঘের উত্তাপ স্তিমিত হওয়ার পর বাম দিকে রক্ষিত হলুদ বর্ণের এক নকশাদার কাঁচ পাত্র হতে যা ফুটন্ত এবং মোহরকৃত মদপূর্ণ ছিল, পরিস্কার পরিচ্ছন্ন মদ্য আমি পান করলাম এবং যখন আমি তা পান করি তখন নিজের মাল লুটিয়ে দিই, কিন্তু আমার মান-ইজ্জতপূর্ণ মাত্রায় থাকে। এর উপর কোন চোট কিংবা আঘাত আসে না। তারপর যখন আমি সজ্ঞানে থাকি, কিংবা যখন আমার জ্ঞান ফিরে আসে তখনো আমি দান করতে কুণ্ঠিত হই না, এবং আমার দয়া-দাক্ষিণ্য যা কিছু সে সব সম্পর্কে তোমরা অবহিত রয়েছ।’’

তাঁরা জুয়া খেলতেন এবং মনে করতেন যে, ‘এটাও হচ্ছে তাঁদের দয়া-দাক্ষিণ্যের একটি পথ। কারণ, এর মাধ্যমে তাঁরা যে পরিমাণ উপকৃত হতেন তার অংশ বিশেষ, কিংবা উপকৃত ব্যক্তিদের অংশ থেকে যা অবশিষ্ট থেকে যেত তা অসহায় এবং মিসকীনদের মধ্যে পান করে দিতেন। এ জন্যই কুরআন কারীমে মদ এবং জুয়ার উপকারকে অস্বীকার করা হয়নি। বরং এ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে,

‏{‏وَإِثْمُهُمَآ أَكْبَرُ مِن نَّفْعِهِمَا‏}‏ ‏[‏البقرة‏:‏219‏]‏

‘‘কিন্তু এ দু’টোর পাপ এ দু’টোর উপকার অপেক্ষা অধিক’।’ (আল-বাক্বারাহ ২ : ২১৯)

২. প্রতিজ্ঞাপরায়ণতাঃ অন্ধকার যুগের আরববাসীগণের অন্যতম চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল প্রতিজ্ঞা পরায়ণতা। ওয়াদা পালন বা অঙ্গীকার রক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কিংবা অন্য কোনভাবে তাঁরা যাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত থাকতেন তাঁদের জন্য সন্তানগণের রক্ত প্রবাহিত করা, কিংবা নিজ বাস্তভিটা বিলুপ্ত করার মতো অতীব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারকেও তাঁরা সামান্য কিছু মনে করতেন। এর যথার্থতা উপলব্ধির জন্য হানি বিন মাস’উদ শাইবানী, সামাওয়াল বিন আদিয়া এবং হাজেব বিন যুরারাহ তামীমী এর ঘটনাবলীই যথেষ্ট।

৩. ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদাবোধঃ জাহেলিয়াত যুগের আরববাসীগণের অন্যতম ব্যক্তি বৈশিষ্ট্য ছিল পার্থিব সব কিছুর উপর নিজের মান ইজ্জতকে প্রাধান্য দেয়া এবং কোন প্রকার অন্যায় অত্যাচার সহ্য না করা। এর ফলে এরূপ দাঁড়িয়েছিল যে, তাঁদের উৎকট অহংবোধ এবং মর্যাদাবোধ সীমা অতিক্রম করে গিয়েছিল। বিশেষ কোন কারণে তাঁদের এ অহং ও মর্যাদাবোধ এর উপর সামান্যতম আঘাত কিংবা অপমান এলেও তাঁরা উত্তেজিত হয়ে পড়তেন এবং তরাবারি, বর্শা, ফলা ইত্যাদি নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে পড়তেন। এ সংঘর্ষে লিপ্ত হতে গিয়ে তাঁদের প্রাণহানির ব্যাপারে কোনই উৎকণ্ঠা থাকত না। প্রাণের তুলনায় মান-মর্যাদাকেই তাঁরা অধিকতর মূল্যবান মনে করতেন।

৪. সংকল্প বাস্তবায়নঃ প্রাক ইসলামি আরববাসীগণের আরও একটি বৈশিষ্ট্য ছিল এ রকম যে, কোন কাজ-কর্মকে মান-সম্মান ও পুরুষের প্রতীক মনে করে যখন তাঁরা সেই কর্ম সম্পাদনের লক্ষ্যে সংকল্পবদ্ধ হতেন তখন তাঁরা প্রাণ বাজী রেখে সেই কর্ম সম্পাদনের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়তেন। পার্থিব কোন শক্তিই তাঁদেরকে এ সংকল্প থেকে বিরত রাখতে পারত না।

৫. ভদ্রতা, ধৈর্য্য ও গাম্ভীর্যঃ ভদ্রতা-শিষ্টতা ও ধৈর্য্য-গাম্ভীর্য আরববাসীগণের নিকট খুবই প্রিয় ও প্রশংসনীয় ছিল। এ সকল মানসিক গুণাবলীকে কোন সময়েই তাঁরা খাটো করে দেখতেন না, কিন্তু তাঁদের উগ্র স্বভাব, উৎকট অহংবোধ ও প্রতিহিংসা পরায়ণতার কারণে খুব কম ক্ষেত্রেই এর যথার্থতা রক্ষা করতে তাঁরা সক্ষম হতেন।

৬. সরলতা ও অনাড়ম্বরতাঃ ইসলাম পূর্ব আরববাসীগণের সংস্কৃতি ধারা থেকে অবগত হওয়া যায় যে, তাঁদের জীবন যাত্রা ছিল অত্যন্ত সহজ সরল এবং অনাড়ম্বর। তাঁদের চিন্তা ও চেতনার মধ্যে ঘোর-প্যাঁচ কিংবা জটিলতার লেশমাত্র থাকত না। উদার, উন্মুক্ত অগ্নিখরা মরু প্রকৃতির মতই তাঁদের মন ছিল উন্মুক্ত, কিন্তু মেজাজ ছিল তীক্ষ্ণ। এ কারণে প্রকৃতিগতভাবেই তাঁরা ছিলেন সৎ এবং সততা প্রিয়। ধোঁকাবাজী এবং বিশ্বাস ভঙ্গের মতো কোন ব্যাপার ছিল তাঁদের সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। গচ্ছিত ধন বা আমানত রক্ষার ব্যাপারটিকে তাঁদের পবিত্রতম দায়িত্ব হিসেবেই তাঁরা গণ্য করতেন।

আমরা সর্বান্তঃকরণে বিশ্বাস করি যে, এ পৃথিবীর কেন্দ্রস্থলে আরব ভূমির অবস্থান, আরব ভূমির ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যগত বিশেষ বিশেষ সুযোগ-সুবিধা, আরববাসীগণের উদার-উন্মুক্ত মানবিক চেতনা, অতিথি পরায়ণতা, সহজ, সরল ও অনাড়ম্বর জীবনযাত্রা এবং আমানত গচ্ছিত রাখার অনপনেয় উপযুক্ততার প্রেক্ষাপটে আরব ভূমিকে ইসলাম প্রচারের কেন্দ্রবিন্দু, আরব জাতিকে আল্লাহর পবিত্রতম আমানত ইসলামকে হেফাজত করার উপযুক্ত মানবগোষ্ঠি, আরবী ভাষাকে আল্লাহর বাণী ধারণ ও বহনের উপযুক্ত ভাষা এবং আরব সম্প্রদায়ের মধ্যে সকল দৃষ্টিকোণ থেকে সর্বোত্তম ব্যক্তিটিকে নবুওয়াত ও রিসালাতের উপযুক্ত বিবেচনা সাপেক্ষে ইসলামের আয়োজন ও বাস্তবায়ন ধারা সূচিত হয়েছিল।

আর সম্ভবত আরবদের এসব চারিত্রিক বৈশিষ্টে বিশেষ করে প্রতিশ্রুত পূর্ণ করা ছাড়াও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও উপকারী বৈশিষ্ট্য তা হলো আত্মমর্যাদাবোধ ও সংকল্পে অটল থাকা। আর এ সব মহৎ গুণাবলী ও স্বচ্ছ পরিষ্কার দৃঢ় সংকল্প ব্যতীত অন্যায় অত্যাচার, ফিতনা ফাসাদ দূরীভূত করা এবং একটি ইনসাফপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। উল্লেখিত এসব চারিত্রিক গুণ ছাড়াও তাদের অনেক উত্তম রয়েছে গুণ যারা অনুসন্ধান করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়।

Leave a Reply

Close Menu