ফিত্‌রা বা সাদকাতুল ফিতর

ফিত্‌রা বা সাদকাতুল ফিতর

ফিত্‌রা বা সাদকাতুল ফিতর
সকল আল্লাহর বান্দার উপর রোজা ফরজ। যা ধনী-গরীব কারো জন্য আলাদা বিধান নাই। পবিত্র রমজানের হুকুম-আহকাম পালনে অনিচ্ছাকৃত কোন রকম ভুল ত্রুটি-বিচ্যুতির ক্ষতি পূরণের জন্য “সাদাকুল ফিতরা” আদায় করা ওয়াজিব। তাকেই ফিত্‌রা বলে।

# ফিতরা কেন দিবেন?
ইসলামের ২য় হিজরীতে রসূল পাক (সঃ) এর উম্মতের উপর রোজা ফরজ হয়। সাথে সাথে রোজার ভুল-ত্রুটির কথা বিবেচনা করে রসূল করিম (সঃ) উম্মতদের “সাদকাতুল ফিত্‌র” আদায়ের নির্দেশ দেন। নামাজের ভুল-ত্রুটির জন্য “সাহু সিজদা” দিয়ে নামাজকে যেমন ত্রুটি মুক্ত করার নির্দেশ। যেমনি “দম” (অতিরিক্ত কোরবানী) দেয়ার মাধ্যমে হজ্ব পালনের দোষ-ত্রুটি মুক্ত করা হয়, তেমনি ফিত্‌রার মাধ্যমে রোজার দোষ-ত্রুটি মুক্ত করার প্রধান কাজ।

# কারা ফিতরা দিবেন?
মালেকী নেছাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হউক বা না হউক, ধনী হউক বা না হউক, মিসকিনই হউক যার উপর রোজা ফরজ তাকেই এই ফিতরা দিতে হবে। সুতরাং এই ফিত্‌রা আদায়ে কেউই বাদ পড়া ঠিক হবে না।

ইবনে আব্বাস (রঃ) বলেছেন, রসূল পাক (সঃ) ছদকায়ে ফিত্‌র ফরজ করেছে, যা রোজাকে দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত করে পবিত্র করে।

# কী পরিমাণ সম্পদ থাকলে ফিতরা দেয়া ফরয হয়?
ঈদের দিন যদি কোন মুসলিম ব্যক্তি ও তার পরিবারবর্গের প্রয়োজনীয় খাবারের চেয়ে অতিরিক্ত আরো ২ কেজি ৪০ গ্রাম পরিমাণ নির্দিষ্ট খাবার মওজুদ থাকে তাহলে ঐ ব্যক্তি ও তার পরিবারবর্গের সকল সদস্যদের উপর ফিত্‌রা প্রদান ফরয হয়ে যাবে।

(ক) আবদুল্লাহ ইবনে ‘উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বাধীন, কৃতদাস, নারী, পুরুষ, ছোট, বড় প্রত্যেক মুসলিমের প্রতি রমাযানের সিয়ামের কারণে এক সা‘আ খেজুর বা এক সা‘আ যব ফিত্‌রা হিসেবে ফরয করে দিয়েছেন। (বুখারী : ১৫০৩; মুসলিম : ৯৮৪)

(খ) আহমাদের একটি বিশুদ্ধ হাদীসে আবূ হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে,

فِيْ زَكَاةِ الْفِطْرِ عَلَى كُلِّ حَرٍّ وَعَبْدٍ ذَكَرٍ وَأُنْثَى صَغِيْرٍ أَوْ كَبِيْرٍ فَقِيْرٍ أَوْ غَنِىٍّ صَاعًا مِنْ تَمَرٍ

প্রত্যেক স্বাধীন, পরাধীন, নারী, পুরুষ ছোট, বড়, ফকীর-ধনী, প্রত্যেকের উপর জনপ্রতি এক সা‘আ (২ কেজি ৪০ গ্রাম) পরিমাণ খেজুর ফিত্‌রা হিসেবে দান করা ওয়াজিব।

তবে ইমাম আবূ হানীফার (রহ.) মতে ঈদের দিন যাকাতের নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে অর্থাৎ ঐদিন ভোরে প্রয়োজনের অতিরিক্ত হিসেবে যার ঘরে সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা বায়ান্ন তোলা রৌপ্য বা এর সমপরিমাণ নগদ অর্থ থাকবে শুধু ঐ পরিবারের উপর ফিত্‌রা দেয়া ফরয হবে।

# ফিতরা কখন দিতে হয়
রোজা শেষ হতে না হতেই শাওয়াল মাসের চাঁদ ওঠার পর প্রধান ইবাদত “ফিতরা আদায়”। এই ফিত্‌রা আদায়ের সময় খুবই কম। চাঁদ দেখার পর হতে ঈদুল ফিতরের নামাজ পড়তে যাবার সময় পর্যন্ত এই ফিত্‌রা আদায় করার সঠিক সময়। সে কারণে এই ফিত্‌রা আদায়ের তৎপর হওয়া দরকার। কাকে দিবেন-কিভাবে দিবেন তা সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়া জরুরি। যাকে দিবেন ঠিক করলেন তাকে পাওয়া না গেলে পরেও তাকে আদায় করতে পারবেন।

# কাদের উপর ফিতরা ওয়াজিব
সমস্ত ইবাদতই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। যার আন্তরিক নিয়ত আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য। ধনী-গরীব তফাৎ এনে একটা ফরজ ইবাদাত থেকে দূরে থাকা উচিত হবে না। পরিবারের প্রধানকেই নিজের ও অন্যান্য সদস্যদের ফিতরা আদায় করা তার উপর ওয়াজিব। তবে প্রাপ্ত বয়স্ক সন্তান এবং বিবাহ দেয়া কন্যার ফিতরা আদায় তার উপর দায়িত্ব নয়।

# ফিতরা কিভাবে আদায় করবেন?
আমরা অনেকেই এই ফিত্‌রা কিভাবে আদায় করতে হয় জানি না। সঠিক মাসালা জানা থাকলে আপনিও খুশিমনে এই ফরজ ফিতরা আদায় করতে পারেন।

কিন্তু সঠিক কতটাকা কিভাবে পরিমাপ করবেন সবকিছু আপনার জানা প্রয়োজন। তবেই আপনি কি ফিতরা স্বতঃফূর্তভাবে আদায় করতে পারবেন। আল্লাহর উদ্দেশ্যে এই রোজা রাখা। এর ভুল-ত্রুটি মুক্ত কিভাবে করা যায় আদায় করার জন্য সঠিক নিয়মটা জানা প্রয়োজন।

রসূল পাক (সঃ) এর সুন্নত হিসাবে এই ফিত্‌রা শস্য দিয়ে আদায়ের নির্দেশ রয়েছে। যা একেবারে নিত্য প্রয়োজনীয়। যেমন : খেজুর, কিশমিশ, মুনাক্কা, যব, আটা, গম, চাল ইত্যাদিতে ফিত্‌রা আদায় করতে হবে।

(ক) স্থানীয়ভাবে উৎপন্ন হয় এমন পণ্য যা সহজেই পাওয়া যায় তার পরিমাপ হবে ১ সাঁ। অর্থাৎ ১ সাঁ পরিমাপ হবে ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম বা ৩,৩০০ গ্রাম।

(খ) বিদেশি পণ্য যা আমদানির মাধ্যমে দেশে আনা হয় তার পরিমাণ অর্ধ সাঁ। অর্থাৎ সাঁ পরিমাপ হবে ১ কেজি ৬৫০ গ্রাম বা ১,৬৫০ গ্রাম।

রসূল পাক (সঃ) এর জমানায় খেজুর, কিশমিশ, মুনাক্কা, যব, এসব সে দেশীয় স্থানীয় পণ্য যা ১ সাঁ পরিমাণ ফিত্‌রা আদায় করতেন। গম, আটা, চাল, এসব ছিলো আমদানিকৃত পণ্য। সে কারণে এ সব পণ্য অর্ধ সাঁ হিসাবে পরিমাপ করে ফিত্‌রা আদায় করতেন।

উল্লেখ্য রসুল (সঃ) নিজেই ব্যবসার মাধ্যমে পণ্য আমদানি-রপ্তানি করতেন। তাই স্থানীয় শস্য ও আমদানিকৃত শস্য দিয়ে ফিত্‌রা আদায় করা হত।

কিন্তু আমাদের হুবহু তা করলে হবে না। স্থানীয় পণ্য-আমদানি পণ্য কি কি বুঝতে হবে। চাল, গম, আটা আমাদের দেশিয়-স্থানীয় পণ্য সে কারণে এসব শস্য দিয়ে ফিতরা আদায় করতে হলে পুরা ১সাঁ বা ৩,৩০০ গ্রাম আদায় করতে হবে। চাল দিয়ে হিসাব (সোজা হিসাব) সচরাচর আমরা প্রতিদিন যে চাল খেয়ে থাকি তার ওজন বা বাজার মূল্য নির্ধারণ করে ফিতরা আদায় করবেন। তার বাজার মূল্য যদি ৪০/- টাকা হয় তা হলে ৩,৩০০ গ্রাম চালের মূল্য ১৩২/- টাকা। এই ১৩২/- টাকা হলো আপনার সঠিক ১টা ফিতরা।

আপনি যদি আমদানি পণ্যতে ফিতরা আদায় করতে চান তাহলে খেজুর দিয়েই বলি- বর্তমানে শুকনা খেজুর মূল্য কেজিতে ১২০/- টাকা। তার অর্ধেক সাঁর ওজন ১,৬৫০ গ্রাম যার মূল্য ১৯৮/- টাকা।

মূল্যের তারতম্য হওয়ার কারণে কিছু টাকা বেশি আদায় করা উত্তম। যারা গরিব তাদের উপর ফিতরা আদায় করাও জরুরি। রোজার দোষ প্রুটি মুক্ত হওয়া প্রয়োজন। এই ফিতরা আদায়ও নিয়ম ভিন্ন। গরিব আপনি যে চাল খান তার ৩,৩০০ গ্রাম চালের একটা ফিতরা জোগাড় করে পরিবারের সদস্যদের মাঝে ১ জন অন্যজনকে বলবে আমার ফিতরাটা তোমাকে দিলাম তুমি গ্রহণ করো। সে তার ফিতরা টা অন্যজনকে দিয়ে বলবে আমার ফিতরাটা তোমাকে দিলাম তুমি বুঝে নিলেতো? এভাবে হাত বদল করে করে টাকাটা ঘরে রেখে দিবে। পরবর্তীতে তা কোন প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করতে পারবে।

# ফিতরা দেওয়ার গুরুত্ত
রমজানের সিয়াম সাধনার পর আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে পুরস্কার হিসাবে বান্দাদের ঈদ উৎসব পালনের ব্যবস্থা করেছেন। এই উৎসবে ধনীদের পাশাপাশি গরিবরাও ঐ আনন্দে সমানভাবে উপভোগ করতে পারে সেই জন্য এই ফিতরা দানের ব্যবস্থা। এই ফিতরা একান্ত গরিব, বিধবা, অসহায় নিকট আত্মীয়ের হক। গরিব মিসকিনদের মাঝেও দান করা যায়। শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখার পর থেকে পরদিন ঈদের জামাত পড়তে যাওয়া পর্যন্ত এই ফিতরা দান করালে বহুগুণ সওয়াব।

আল্লাহতায়ালা রোজাদারের প্রতিদান (পুরস্কার) নিজের হাতেই দান করবেন ঘোষণা দিয়েছেন। সেই রোজাকে ত্রুটি মুক্ত করতে ফিতরা বিধান। আমরা ধনী-গরীব সকলেই এই ফিতরা আদায় করে আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য তৎপর হবো। আল্লাহ আমাদের তৈৗফিক দান করুন। আমীন।

Leave a Reply