যাকাত কী ও কেন?

যাকাত কী ও কেন?

# যাকাত কী ও কেন?
যাকাত ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের অন্যতম। কোন ব্যাক্তি যখন কালেমা পড়ে ইসলামের সীমার মধ্যে দাখিল হয়, তখন থেকেই ইসলামের যাবতীয় বিধি-নির্দেশ মেনে চলা তার জন্য অপরিহার্য।

যাকাত আদায় করা সচ্ছল মুসলমানের প্রতি সৃষ্টিকর্তার অলঙ্ঘনীয় নির্দেশ। কোন মুসলমানের স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে এ নির্দেশ অমান্য করার অর্থই হলো আল্লাহ ও ঁতার রাসূলের সাথে মুনাফেকী করা।

যাকাত শব্দের অর্থ পবিত্র করা, পরিশুদ্ধ করা বা প্রবৃদ্ধি দান করা। শরীয়তের ভাষায়, সুনির্ধারিত সম্পদ সুনির্ধরিত শর্তে তার হকদারকে অর্পণ করা। এক কথায় কোন মুসলমান আল্লাহ নির্ধরিত (নিসাব) পরিমান সম্পদের মালিক হলে এবং তা এক বছর পর্যন্ত তার কাছে থাকলে তার নির্ধারিত পরিমান অংশ হকদারের কাছে পৌছে দেয়াকে যাকাত বলা হয়। সুনির্ধারিত অংশটি শরীয়ত সম্মতভাবে আদায় না করলে গোটা সম্পদই মুমিনের জন্য হারাম হয়ে যায়।

# যাকাত দাতা হওয়ার শত্যবলি:
প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ-মস্তিষ্ক প্রত্যেক মুসলিম নরনারীর মালিকানায় নিসাব পরিমাণ জাকাতযোগ্য সম্পদ থাকলে এবং তা এক চন্দ্রবছর অতিবাহিত হওয়ার পর তার ওপর যাকাত আদায় করা ফরজ হবে। (রদ্দুল মুহতার ২/২৫৮; বাদায়েউস সানায়ে ২/৭৯, ৮২)

# যিনি যাকাত দেবেন তার মধ্যে নিন্মলিখিত বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে-

1. প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া: নাবালেগের উপর যাকাত ফরজ হয় না।

2. যাকাত দেয়ার জন্য নিয়ত করা: নিয়ত না করে নিজের সকল সম্পদ সদকা করলেও যাকাত হবে না।

3. বুদ্ধি-বিবেক সম্পন্ন হওয়া: পাগলে জন্য যাকাত ফরজ নয়।

যাকাত সম্পর্কে কোরআনে যা বলা হয়েছে:
যারা বিশ্বাসী ও সৎকর্মশীল, নামাজ কায়েশ করে ও যাকাত আদায় করে তাদের জন্যে রয়েছে উত্তম পুরষ্কার। তাদের কোনো ভয়, পেরেশানি ও দু:খ থাকবে না। (বাকারা: 277)

ইসলামের অনেক জায়গায় যাকাত কথাটির উল্লেখ আছে কোরআনে। ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভের মধ্যে যাকাত একটি নির্দেশনা।

কোরআনের বহু জায়গায় যাকাত ও সালাতের কথা অতোপতো ভাবে জড়িত।

আল্লাহ্পাক সূরা রুমের ৩৯ নাম্বার আয়াতে বলছেনঃ

“ওয়ামা আ-তাইতুম মিন যাকা-তিন তুরিদুনা ওয়াজ্বহাল্লা হি ফাউল ইকা হুমুল মুদ্ব’ইফুন”

অর্থঃ এবং তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের লক্ষে যাকাত দান করে, তাহাদিগের ধন ও সম্পদ বৃদ্ধি পায়; ওরাই সমৃদ্ধশালী।

কোরআন বলছে

“আকিমুস সালা-তা ওয়া আ-তুয্ যাকা-তা ওয়া আকরি দুল্লা-হা ক্বারদান হাসানান”

অর্থঃ সালাত প্রতিষ্ঠিত করো, যাকাত আদায় করো। এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ বা কর্জে হাসানা দাও।

যাকাতকে কোরআনে সদ্কাও বলা হয়েছে। “যাকাত” শব্দটি “জাক্কা” শব্দ হতে এসেছে; যার অর্থ পবিত্র হওয়া বা নিজেকে শুদ্ধ করা।

সূরা তওবার ১০৩ নং আয়াতে আল্লাহ্ বলছেনঃ

“খুয্মিন আমওয়া-লিহিম সাদাকাতন তুত্বাহহিরুহুম ওয়া তুযাক্কিহিম বিহা ওয়া সাল্লি আলাইহিম”

অর্থঃ ওদর সম্পদ হওত সদ্কা গ্রহণ করো, ইহা দ্বারা তুমি তাহাদিগকে পাক করিবে ও আশীর্বাদ করিবে।

এ যাকাত অন্যাণ্য নবী-রাসুলদের উম্মতের বেলায়ও ছিলো বলে কোরআন সাক্ষ্য দেয়;

সূরা বাকারা ৮৩ নং আয়াতে।

সূলা মুমিনুনের ৪ নং আয়াতে বলা হয়েছেঃ

“ওয়াল্লাযিনা হুম লিয্যাকা-তি ফা-ইলুন”

অর্থঃ যারা স্বীয় যাকাত প্রদানে সক্রিয়।

কালেমা সাওম বা রোজা ও হাজ্জ্ব সম্পর্কে কোরআনে পৃথক পৃথক নির্দেশ এসেছে এবং কালেমার বিষয়টি মৌলিকভাবে নির্দেশ আছে। কিন্তু সালাত ও যাকাতকে একই সঙ্গে একই আয়াতে বার বার নির্দেশ দেয়া আছে বিভিন্ন আঙ্গিকে। এই রহস্যটি সকলকে জানতে হবে,এটা আসলেই জানার বিষয়। কেন কোরআন সালাতের সাথে যাকাতের নির্দেশ দিচ্ছে। যাকাত পাবে নিঃস্ব, ফকির, মিসকিন ও মুসাফির।

সূরা তওবা ৬০ আয়াত। সালাত,রোজা.হাজ্জ্ব, কলেমা ও যাকাত ইসলামের পঞ্চ স্তম্ভ হলেও যাকাত ও হাজ্জ্ব সামর্থবান মানুষের জন্য নির্ধারিত বলে হাদীসে কথিত আছে।

আল্লাহ পাক সুরা তওবার ১০৩ নং আয়াতে ঘোষণা দেনঃ
“হে নবী! আপনি তাদের (ধনীদের) ধনসম্পদ থেকে সদকা (যাকাত) নিয়ে তাদরেকে পাক পবিত্র করুণ, (নেকীর পথে) তাদেরকে এগিয়ে দিন এবং তাদের জন্য রহমতের দোয়া করুণ। আপনার দোয়া তাদের সান্ত্বনার কারণ হবে। আল্লাহ সব কিছু শুনেন ও জানেন।” (সুরা তওবাঃ ১০৩)

তাদের এ মর্মে আদেশ করা হয়েছে যে, তারা নিবিষ্ট মনে একান্তভাবে শুধুমাত্র আল্লাহর এবাদত করবে, যথাযথভাবে সালাত আদায় করবে, যাকাত প্রদান করবে, আর এটাই হলো সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন। (বাইয়্যিনাহঃ ৫)
“যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে, সৎ কাজ করেছে, নামায প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং যাকাত প্রদান করেছে, তাদের জন্য পুরস্কার তাদের পালনকর্তার কাছে রয়েছে। তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা দুঃখিত হবে না।” (সুরা বাক্বাররাঃ ২৭৭)

# যাকাত সম্পর্কে হাদিসে যা বলা হয়েছে:
হে মানুষ! তোমরা তোমাদের প্রভুর ইবাদত করবে। নামাজ কায়েম করবে, রোজা রাখবে, যাকাত আদায় করবে, হজ্জ করবে আর সঙ্ঘবদ্ধভাবে নেতাকে অনুসরণ করবে, তাহলে তোমরা জান্নাতে দাখিল হতে পারবে। (বিদায় হজ্জ্বের ভাষণে রাসূলুল্লাহ স.)

আবি আবদুর রহমান আবদুল্লাহ ইবনে ওমার ইবনুল খাত্তাব (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে শুনেছি যে, “ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত। এতে সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নাই এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর প্রেরিত রাসুল, নামায প্রতিষ্ঠা করা, যাকাত দেয়া, শারীরিক ও আর্থিক সামর্থ্য থাকলে হজ্জ্ব করা এবং রমযান মাসে রোযা রাখা”। (বুখারী ও মুসলিম)

# যাকাতের অর্থ ব্যায়ের শরিয়ত নির্ধারিত খাত:
যাকাত নিজ হচ্ছেমত যাকে-তাকে দিলে আদায় হবে না। আল্লাহ তায়ালা যাকাতের ৮টি খাত উল্লেখ করেছেন।

১. ফকির: ফকির এমন মজুর ও শ্রমজীবীকে বলা হয়, যে শারীরিক ও মানসিকভাবে কর্মক্ষম হওয়া সত্ত্বেও প্রতিকূল অবস্থার কারণে বেকার ও উপার্জনহীন হয়ে পড়েছে। যে সব অভাবগ্রস্থ মেহনতি লোক কোন জালিমের জুলুম হতে আত্মরক্ষার জন্যে জন্মভূমি ছেড়ে এসেছেন বা আসতে বাধ্য হয়েছেন তাদেরকেও ফকির বলা যেতে পারে।

২. মিসকিন: দৈহিক অক্ষমতা যাকে নিস্কর্মা ও উপার্জণহীন করে দিয়েছে তাকে মিসকিন বলে। বার্ধক্য, রোগ, অক্ষমতা, পঙ্গুত্ব যাকে উপার্জনের সুযোগ হতে বঞ্চিত করেছে অথবা যে ব্যাক্তি উপার্জন করতে পারে কিন্তু তা দ্্বারা তার প্রকৃত পয়োজন মোটেই পূর্ণ হয় না; অন্ধ, পক্ষাঘাতগ্রস্থ, পঙ্গু, খাদ্য-বস্ত্র ও আশ্রয়হীন শিশু ইত্যাদি সকলকেই মিসকিন বলা হয়।

৩. যাকাত বিভাগের কর্মচারীদের বেতন-ভাতা: যাকাত আদায় এবং তা সুষ্ঠু ও সুনির্দিষ্টভাবে বন্টন করার কাজে যারা সার্বক্ষনিক নিযুক্ত থাকবে এবং যারা অন্য কোনভাবে জীবিকা নির্বাহের ব্যাবস্থা করতে অক্ষম, সেসব কর্মচারীর নূন্যতম প্রয়োজন পূরণার্থে আদায়কৃত যাকাত থেকে তাদের বেতন -ভাতা দেয়া হবে।

৪. নও মুসলিমদের মন আকৃষ্ট করা: অমুসলিমদের অত্যাচার থেকে মুসলিম সমাজকে রক্ষার জন্যে যাকাতের সম্পদ ব্যায় করা যাবে। ইসলাম প্রচারের কাজ কোথাও প্রতিরোধের সন্মুখীন হলে সে ক্ষেত্রে যাকাতের অর্থ ব্যায় করা যাবে। সংগতিহীন নও মুসলিমকেও স্বনির্ভর করার কাজে যাকাতের অর্থ ব্যায় হতে পারে।

৫. ক্রীতদাস মুক্তি: যেসব দেশে দাস প্রথা চালু আছে এবং মুসলমানদেরকে দাস বানিয়ে রাখা হয়েছে সেখানে দাসদেরকে অর্থ দিয়ে মুক্ত করার কাজে যাকাতের সম্পদ ব্যায় করা যাবে।

৬. ঋণমুক্তি : প্রথমত, যারা নিজেদের দৈনিন্দিন প্রয়োজন পূরণ করতে গিয়ে ঋনগ্রস্থ হয়েছে এবং সে ঋন পরিশোধে অক্ষম হয়ে পড়েছে, তাদেরকে যাকাতের সম্পদ হতে সাহায্য করা যাবে। দ্বিতীয়ত, যারা মুসলমানদের সামষ্টিক কল্যাণ ও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ঋন গ্রহণ করে, তাদের সে ঋন শোধ করার জন্য যাকাত দেয়া যাবে।

যাদের বাড়ি-ঘড় আগুনে ভস্মীভূত হয়ে গেছে, বন্যা-প্লাবনে মাল-আসবাব ভেসে গেছে, তাদের পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণের জণ্যে যাকাতের সম্পদ দেয়া যাবে।

৭. ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠার ব্যাবস্থা: যাকাতের ৭ম খাত হলো ‘ফি সাবীলি্লাহ’ (আল্লাহর পথে)। ইসলামী চিন্তাবিদগণের সম্মিলিত মত হলো:

ক. আল্লাহ নির্দেশিত পথে প্রতিটি জনকল্যাণকর কাজে, দ্্বীন ইসলামের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে যত কাজ কার সম্ভব সে সব ক্ষেত্রেই এ অর্থ ব্যায় করা যাবে। (ইসলামের অর্থনীতি- আল্লামা মুহাম্মদ আবদুর রহীম, পৃ-277)

খ. ‘ফী সাবী লিল্লাহ’র ব্যাবহারিক অর্থ জিহাদ ছাড়া আর কিছু নয়। কোরানের যেখানেই সাবী লিল্লাহ কথাটির উল্লেখ রয়েছে সেখানেই তার অর্থ হিসেবে জিহাদকে বোঝানো হয়েছে; মাত্র দু-একটি ক্ষেত্র ছাড়া। (আল্লামা ইবনে কুদামা: ইসলামের যাকাত বিধান- 2য় খন্ড, পৃ- 37)

গ. ইসলামী জনকল্যাণমূলক সংস্থাসমূহকে যাকাত দেয়া জায়েজ। (মুফতি শায়খ হোসাইন মাখলুক, ইলামের যাকাত বিধান- 2য় খন্ড, পৃ- 147)

৮. মুসাফির: যাকাতের 8ম খাত হলো ‘ইবনুস সাবীল’ (নি:স্ব পথিকেদের জন্যে)। সৎ উদ্দেশ্যে দেশ ভ্রমণে বেরিয়ে যারা পথিমধ্যে নি:সম্বল হয়ে পড়েছে, তাদেরকে যাকাতের অর্থ দেয়া যাবে।

# জাকাতের নিসাব
* স্বর্ণের ক্ষেত্রে নিসাব হলো সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি।
* রুপার ক্ষেত্রে নিসাব হলো সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি।
* টাকা-পয়সা ও ব্যবসায়িক পণ্যের ক্ষেত্রে নিসাব হলো সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা, হাদিস: ৯৯৩৭)

# যেসব জিনিসের ওপর জাকাত ফরজ হয়
১. সব ধরনের সম্পদ ও সামগ্রীর ওপর যাকাত ফরজ হয় না। শুধু সোনা-রুপা, টাকা-পয়সা এবং ব্যবসার পণ্যে যাকাত ফরজ হয়। আলবাহরুর রায়েক ২/২০৯
২. ব্যাংক-ব্যালেন্স, ফিক্সড ডিপোজিট, বন্ড, ট্রেজারি বিল, ব্যাংক গ্যারান্টি মানি ইত্যাদি নগদ টাকা-পয়সার মতোই। এসবের ওপর যাকাত ফরজ হবে।
৩. সোনা-রুপার অলঙ্কার সবসময় বা কালেভদ্রে ব্যবহৃত হোক কিংবা একেবারেই ব্যবহার না করা হোক, সব অবস্থায় তার যাকাত দিতে হবে। (সুনানে আবু দাউদ ১/২৫৫, হাদিস : ১৫৬৩; সুনানে কুবরা, নাসায়ি, হাদিস : ২২৫৮)
৪. হজের উদ্দেশ্যে কিংবা ঘরবাড়ি নির্মাণ, ছেলেমেয়ের বিয়ে-শাদি ইত্যাদি প্রয়োজনের জন্য যে অর্থ সঞ্চয় করা হয়, তা-ও এর ব্যতিক্রম নয়। সঞ্চিত অর্থ পৃথকভাবে কিংবা অন্যান্য যাকাতযোগ্য সম্পদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিসাব পরিমাণ হলে বছরান্তে এর ওপরও যাকাত ফরজ হবে। অবশ্য বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই যদি খরচ হয়ে যায়, তাহলে তার যাকাত দিতে হবে না। (মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক, হাদিস: ৭০৩২)

# কখন কীভাবে যাকাত দিতে হবে?
*যেদিন চন্দ্রবছর হিসেবে এক বছর পূর্ণ হবে, যেমন এক রমজান থেকে পরবর্তী রমজান পর্যন্ত, সেদিন সঞ্চিত সম্পদের ওপর যাকাত ফরজ হয়ে যায়। তাই যাকাত ফরজ হওয়ার পর বিলম্ব না করে আদায় করে দেয়া উত্তম। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা, হাদিস: ১০৫৫৯; বাদায়েউস সানায়ে ২/৭৭)
* যে সম্পদের ওপর যাকাত ফরজ হয়েছে, এর চল্লিশ ভাগের এক ভাগ (২.৫%) যাকাত আদায় করা ফরজ। (মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক, হাদিস : ৭০৭৭)
* ব্যবসায়িক পণ্যের ক্ষেত্রে পাইকারি বাজারদর অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণ করে যাকাত আদায় করবে।

# যাকাত যার প্রাপ্য!
ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে জাকাত একটি। এর হক্ব ঠিকমতো আদায় না হলে আমরা নিজেকে পুরোপুরি মুসলমান বলে দাবী করতে পারি না। কেননা, আল্লাহ পাক আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন পুরোপুরি রূপে ইসলামে প্রবেশ করার জন্য। আপনার জাকাত প্রকৃত হকদারকে দিচ্ছেন তো? সাবধান, কিছু মানুষের মিথ্যা প্রচারণায় বিভ্রান্ত হয়ে টিভি চ্যানেলসহ কোন প্রতিষ্ঠানকে দিলে আপনার ফরজ আদায় হবে না। পবিত্র কুরআনে পরিষ্কারভাবে জাকাত বা সাদাকা প্রাপ্যদের তালিকা দেয়া হয়েছে। আল্লাহ পাক বলেনঃ

“সাদাকাহ বা জাকাত পাবার যোগ্যতা রাখে শুধুমাত্র ফকির, মিসকীন, যাকাত সংগ্রহকারী, যাদের অন্তরে (ইসলামের প্রতি) ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনা আছে, আর ক্রীতদাস মুক্তিতে, ঋণগ্রস্থরা, যারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে আর মুসাফির। এটা আল্লাহর তরফ থেকে ফরয। আল্লাহ পাক সমস্ত কিছু জ্ঞাত আছেন, আর তিনি হিকমাতওয়ালা।” (সুরা তাওবাহ আয়াত ৬০)
উপরোক্ত আয়াতে ৮ ধরনের লোকের কথা বলা হয়েছে।

১) ফকিরঃ

তার যা প্রয়োজন তা তার কাছে একেবারেই নেই ।

২) মিসকীনঃ

মিসকীন ফকিরের চেয়ে উত্তম । যেমন তার প্রয়োজন ১০ টাকার আছে মাত্র ৭ টাকা। আল্লাহ বলেন – “আর ঐ নৌকা যা ছিল কয়েকজন মিসকীনের, যারা সমুদ্রে কাজ করত।” (সুরা কাহাফ আয়াত ৭৯)

৩) যাকাত সংগ্রহকারীঃ

ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় কোষাগারের জন্য শরীয়ত নির্দিষ্ট যাকাত আদায়কারী আমেল। এটা ইসলামী রাষ্ট্রপ্রধান দ্বারা নিযুক্ত হতে হবে। নিজে নিজে মনে করে নিলে হবে না। {জাওয়াহিরুল ফিক্বহ-৬/৬৯}

৪) যাদের অন্তর ইসলামের দিকে ঝুঁকেছেঃ

যে সমস্ত গরীব বিধর্মী যারা ইসলাম গ্রহণ করতে চায় বা মুসলিমদের শত্রুর হাত হতে রক্ষা করতে চায় তাদের যাকাত দেওয়া যাবে। যেমন সফওয়া ইবনু উমাইয়াকে হুনাইন যুদ্ধের গণীমাত দিয়েছিলেন। রাসুল (দঃ) আবু সুফিয়ান ইবনু হারবকে, আক্‌বা ইবনু হাবেসক এবং উয়াইনাহ ইবনু মিহসানকে জাকাত দিয়েছিলেন (মুসলিম)।

৫) ক্রিতদাস মুক্তিতেঃ

দাসদের মুক্ত করা, শত্রুর হাতে বন্দী তাদেরও মুক্ত করা ইত্যাদি। যেহেতু বর্তমানে দাসপ্রথা নেই। তাই এ খাতটি বাকি নেই।

৬) ঋণগ্রস্থঃ

সেসব গরীব যারা ঋণ করেছে এবং শোধ করার সামর্থ নেই তাদের যাকাতের টাকা দিয়ে সাহায্য করা যাবে। বাংলাদেশসের লক্ষ লক্ষ ঋণ খেলাফী ধনী এর আওতায় আসবেনা যারা ব্যাংক থেকে টাকা ধার নিয়ে শোধ করতে পারছে না। তাদের ওই ঋণ জীবন বাঁচানোর তাগিদে নেয়া হয়নি। বরং তা নেয়া হয়েছিলো নিজেদের বিলাশিতাকে পরিপূর্ণ করার মানসে।

৭) যারা আল্লাহর রাস্তায় আছেঃ

যারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করে। বর্তমানে জিহাদের অপব্যাখ্যা করা হচ্ছে। কাজেই এটি একটি বিতর্কিত বিষয়। এতিমখানায় দেয়া যেতে পারে যেখানে গরীব বাচ্চারা লেখাপড়া করে। তবে প্রাপ্ত জাকাত বা ফিতরার টাকা থেকে শিক্ষকদের বেতনভাতা দেয়া যাবেনা। {আদ দুররুল মুখতার-৩৪৩, হিদায়া-১/১৮৫, রূহুল মাআনী-৬/৩১৩}

৮) মুসাফিরঃ

ঐ মুসাফির যে এক স্থান হতে অন্য স্থানে বা দেশ হতে অন্য দেশে গেছে কিন্তু টাকার অভাবে নিজ গৃহে ফিরতে পারছে না। তাকে ঐ পরিমান যাকাত দেয়া হবে যাতে নিজের গৃহে ফিরে আসতে পারে। যদি কোথাও ধার কর্জ পায় তবে যাকাত নিতে পারবে না।

উপরোক্ত ক্যাটাগরিতে যাকাত আদায় করলেই কেবল যাকাত আদায় হবে। অন্য কাউকে যাকাত দিলে তা আদায় হবে না। ফুক্বাহায়ে কেরাম যাকাত আদায়ের জন্য একটি শর্তারোপ করেছেন এই যে, যাকাতের টাকার মালিক বানিয়ে দিতে হবে দানকৃত ব্যক্তিকে। যদি মালিক বানিয়ে দেয়া না হয়, তাহলে যাকাত আদায় হবে না।

যেমন কাউকে কোন বস্তু ভোগ দখলের অধিকার দিয়ে নিয়ত করল যাকাতের, তাহলে এর দ্বারা যাকাত আদায় হবে না। সেই হিসেবে কোন প্রতিষ্ঠান, মাদরাসা, মসজিদে যাকাতের টাকা দেয়া জায়েজ নয়, যদিও তাতে গরীব মানুষ থাকে, নামায পড়ে, পড়াশোনা করে। তবে প্রতিষ্ঠানের গরীবদের, মাদরাসা গরীব ছাত্রদের, মসজিদের গরীব মুসল্লিদের যাকাত দিলে তাতে মালিক বানিয়ে দেয়ার বিষয়টি থাকায় তা জায়েজ হবে। {ইনায়া আলা ফাতহিল কাদীর-২/২৬৭-২৬৮, আল হিদায়া-১/২০৫, তাবয়ীনুল হাকায়েক-১/২৯৯}

# যাদেরকে যাকাত দেয়া যাবে না
* যে ব্যক্তির কাছে যাকাতযোগ্য সম্পদ নিসাব পরিমাণ নেই, কিন্তু অন্য ধরনের সম্পদ, যাতে যাকাত আসে না, যেমন ঘরের আসবাবপত্র, পরিধেয় বস্ত্র, জুতা ইত্যাদি প্রয়োজনের অতিরিক্ত ও নিসাবের সমমূল্য পরিমাণ আছে, তাকে যাকাত দেয়া যাবে না। (বাদায়েউস সানায়ে ২/১৫৮)
* যাকাতের টাকা কোনো জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা যাবে না। ব্যয় করা হলে যাকাত আদায় হবে না। যেমন—রাস্তাঘাট, পুল নির্মাণ করা, কূপ খনন করা, বিদ্যুত্-পানি ইত্যাদির ব্যবস্থা করা। কেননা শরিয়তে যাকাতের বিধান দেয়া হয়েছে ব্যক্তির প্রয়োজন পূরণের জন্য; সামাজিক প্রয়োজন পূরণের জন্য নয়। যাকাতের টাকা দ্বারা মসজিদ-মাদরাসার বিল্ডিং নির্মাণ করা, ইসলাম প্রচারের জন্য ব্যাপকভাবে ব্যয় করা, ইমাম-মুয়াজ্জিনের বেতন-ভাতা দেয়া, ওয়াজ-মাহফিলের জন্য ব্যয় করা বা এগুলোতে সহায়তা দেয়া, মিডিয়া তথা রেডিও, টিভি চ্যানেল করা জায়েজ নয়; বরং যাকাতের টাকা তার হকদারকেই মালিক বানিয়ে দিতে হবে। অন্য কোনো ভালো খাতে ব্যয় করলেও যাকাত আদায় হবে না। (মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক, হাদিস : ৬৯৪৭, ৬৯৪৮, ৭১৩৭, ৭১৭০; রদ্দুল মুহতার ২/৩৪৪)
* নিজের বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি, পরদাদা প্রমুখ ব্যক্তি—যারা তার জন্মের উত্স তাদের নিজের যাকাত দেয়া জায়েজ নয়। এভাবে নিজের ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনি এবং তাদের অধস্তনকে নিজ সম্পদের যাকাত দেয়া জায়েজ নয়। স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে যাকাত দেয়া জায়েজ নয়। (রদ্দুল মুহতার ২/২৫৮)

Leave a Reply

Close Menu