হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে স্বপ্নে দেখার কিছু আমল।

হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে স্বপ্নে দেখার কিছু আমল।

হুজুর রাসুলুল্লাহ ﷺ কে স্বপ্নে কিভাবে দেখা যায়।
হুজর রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

من رآني في المنام فقد رآني، فإن الشيطان لا يتمثل في صورتي

“যে স্বপ্নে আমাকে দেখল সে আমাকেই দেখল, কারণ শয়তান আমার রুপ ধারণ করতে পারেনা”। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং-২২৬৬, তিরমিজি, হাদিস নং-২২৮০, সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস নং-৩৯০১)

من راني فقد راي الحق

“যে আমাকে দেখল সে “সত্য” দেখল”।
(সহিহ বুখারি, জ্ঞান অধ্যায়, হাদিস নং-১১০, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং-২২৬৭, সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস নং-৩৯০০)

من راني في المنام فسيراني في اليقظة

“যে আমাকে স্বপ্নে দেখেছে সে অচিরেই জাগ্রত অবস্থায়ও আমাকে দেখবে”। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং-২২৬৬)

لا تمس النار مسلما من رآني أو رأي من رآني

“যে মুসলিম আমাকে দেখল তাকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না, আমাকে যে দেখল তাকে যে দেখল তাকেও না।”- তিরমিজি, হাদিস নং-৩৮৫৮

হুজুর রাসুলুল্লাহ ﷺ বলছেন, “আমার জন্য শক্ত ভালবাসায় সিক্ত একদল উম্মত হবে যারা তাদের মাল ও পরিবারের বিমিময়েও আমাকে দেখতে চাইবে”। -সহিহ মুসলিম, হাদিস নং-২৮৩২, হাকিম, হাদিস নং-৬৯৯১

তাই মুহাক্কিক উলামাগন এ সম্পর্কে বলেন, হুজুর রাসুলুল্লাহ ﷺ কে স্বপ্নে দেখতে পারাটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ, যেকোন উম্মতের জন্য এটা অনেক বড় একটি বিষয়। এটা প্রমাণ করে যে আপনার ইমান সঠিক তরিকার ওপরে আছে। আপনি আল্লাহর মাকবুল বান্দা। অথবা আপনাকে আল্লাহর কাছে মাকবুল বা গ্রহণযোগ্য বানানোর জন্যই হুজুর রাসুলুল্লাহ ﷺ আপনার স্বপ্নে এসেছেন। আপনি যদি হুজুর রাসুলুল্লাহ ﷺ কে স্বপ্নে হাসি খুশি অবস্থায় দেখেন, তবে তা আপনার জন্য সুসংবাদ। আপনি ইমানের ওপর আছেন, আপনার আমল-আখলাক ঠিক আছে। আর যদি মলিন চেহারায় দেখেন অথবা রাগান্বিত অবস্থায় দেখেন তবে ধরে নিবেন যে, আপনার ইমান আমল আখলাক সঠিক রাস্তায় নেই। আপনি নিজেকে ইসলাহ করে নিন। তওবা করে সঠিক রাস্তায় আসুন।

হজরত বায়েজিদ বুস্তামি রাহঃ যখন প্রাপ্তবয়স্ক হলেন, তিনি তাঁর আম্মাজানকে বললেন, আম্মাজান আমি মনে হয় বড় হয়ে গেছি। তাঁর আম্মাজান বুঝতে পারলেন যে, বায়েজিদ তাকে বিয়ে করানোর জন্য ইশারা দিচ্ছেন। তিনি বললেন, বাবা তুমি বড় হয়ত হয়েছ, কিন্তু এখনো পরিপূর্ণ মানুষ তুমি হও নি। অর্থ্যাৎ ইনসানে কামিল তুমি হওনি। রাস্তা বহু দূর বাবা।

হজরত বায়েজিদ বুস্তামি রাহঃ জিজ্ঞেস করলেন, আম্মজান আমি কিভাবে ইনসানে কামিল হতে পারি?

আম্মাজান জবাব দিলেন , যেদিন তুমি হুজুর রাসুলুল্লাহ ﷺ কে স্বপ্নে দেখবে সেদিন।

বায়েজিদ বুস্তামি রাহঃ জিজ্ঞেস করলেন, আম্মাজান কী করলে আমি হুজুর রাসূললুল্লহ আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্বপ্নে দেখতে পারি?

আম্মাজান জবাব দিলেন, চারটি কাজ করলে তুমি হুজুর রাসুলুল্লাহ ﷺ কে স্বপ্নে দেখার আশা করতে পার।

১. বেশি বেশি করে নবিজির ﷺ ওপরে দরুদ পড়বে। এটা তোমাকে নবিজির ﷺনিকটে নিয়ে যাবে দুনিয়া ও আখিরাতে।

عَن أَبِي هُرَيرَةَ رضي الله عنه أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ: ((مَنْ صَلَّى عَلَيَّ وَاحِدَةً، صَلَّى الله عَلَيْهِ عَشْرًا))؛ رواه مسلم.

হজরত আবু হরায়রা রাঃ বলেন, হুজুর রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, যে আমার ওপরে একবার দরুদ পড়বে আল্লাহ তার ওপর দশবার দরুদ পড়বেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং- ৪০৮)

أَوْلى النَّاسِ بِي يوْمَ الْقِيامةِ أَكْثَرُهُم عَليَّ صَلاَةً

“সে আমার সবচাইতে নিকটে থাকবে কাল কেয়ামতে,
দিনে, তাদের মধ্যে যে সবচাইতে বেশি দরুদ পড়ে আমার ওপর”। তিরমিজি-হাদিস নং-৪৮৪

إنَّ مِن أَفْضلِ أيَّامِكُمْ يَوْمَ الجُمُعةِ، فَأَكْثِرُوا عليَّ مِنَ الصلاةِ فِيهِ، فإنَّ صَلاتَكُمْ معْرُوضَةٌ علَيَّ

“তোমাদের জন্য সবচাইতে উত্তম দিন হলো শুক্রবার, তাই এই দিনে তোমরা আমার ওপরে বেশি বেশি করে দরুদ পড়। তোমাদের দরুদ আমার কাছে পেশ করা হয়”। সুনান আবি দাউদ, হাদিস নং- ১৫৩১

ما من أحد يسلم علي إلا رد الله علي روحي حتى أرد عليه السلام
“কেহ যখন আমার ওপর সালাম দেয়, আল্লাহ পাক আমাকে রুহ ফিরিয়ে দেন (ক্ষমতা দেন) আমি তার সালামের জবাব দিই”। সুনানে আবি দাউদ, হাদিস নং- ২০৪১

দরুদের ফজিলত সংক্রান্ত হাদিস অসংখ্য অগুনিত। নবিজি ﷺ বলেছেন, “যে আমার ওপরে একবার দরুদ পড়ে, আল্লাহ তাকে দশটি সওয়াব দেন, তার দশটি গুনাহ ক্ষমা করে দেন এবং তার মর্যাদা দশগুন বাড়িয়ে দেন”।

কাজেই নবি কারিমের ﷺ সাথে সম্পর্ক স্থাপনের প্রধান মাধ্যম হচ্ছে বেশি বেশি করে দরুদ পড়া। দরুদে সওয়াব পাওয়া যায়, গুনাহ মাফ হয় এবং মর্যাদা বৃদ্ধি পায়, কিন্তু সালামের জবাব আসে। আর আশিকের জন্য এর চাইতে বড় আর কী হতে পারে? আশিক সবসময় তার মাশুকের দরবার থেকে জওয়াব প্রত্যাশী। তাই আমাদেরকে বেশি বেশি পরিমাণে দরুদ ও সালাতু সালাম পাঠ করতে হবে। এক বুজুর্গকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, বেশি বেশি দরুদ পড়ার সর্বনিম্ন পরিমাণ কী? তিনি জবাব দিয়েছিলেন, কমপক্ষে দিনে ৩০০ বার।

সহিহ হাদিসে এসেছে,
إن لله ملائكة سياحين يبلغوني عن أمتي السلام

অর্থ্যাৎ কিছু ফেরেশতা আছেন নিয়োজিত যারা সারাদিন শুধু সালাম ও দরুদ যারা পাঠ করছেন তাদের নাম পরিচয়সহ প্রিয় নবিজির ﷺ কাছে পেশ করেন যে, অমুকের ছেলে অমুক আপনার ওপরে দরুদ পড়েছে, সালাম দিয়েছে। এভাবে আমাদের নাম-পরিচয় দিনে যতবার প্রিয় নবিজির ﷺ কাছে পেশ করা হয় তত তিনি আমাদেরকে বেশি করে চিনেন এবং কাছে টেনে নেন। (তথ্যসূত্রঃ সুনান নাসাই, হাদিস নং-১২৮২, আবু দাউদ, হাদিস নং-২০৪২)

২.প্রিয় নবিজির ﷺ সাথে আত্মিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রচেষ্টা। এটাই ভালবাসা। অনেকেই বাহ্যিক সুন্নাতের অনুসরণ করাকে নবিজির ﷺ ভালবাসা বানিয়ে দিতে চান। না, ভালবাসা এটা নয়, বরং ভালবাসা হচ্ছে কারো প্রতি অন্তর ঝুঁকে যাওয়ার নাম। আর অনুসরণ হচ্ছে ভালবাসার শাখাপ্রশাখা। যে যাকে ভালবাসে সে তাকে অনুসরণ করতে চেষ্টা করে। ভালবাসা কী জিনিস তা আমরা একখানা হাদিস থেকেই বুঝতে পারি, হুজুর রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “আমার জন্য শক্ত ভালবাসায় সিক্ত একদল উম্মত হবে যারা তাদের মাল ও পরিবারের বিমিময়েও আমাকে দেখতে চাইবে”। (তথ্যসূত্র: সহীহ মুসলিম , অধ্যায় নং ৫৩, বেহেশত ও তার অধিবাসী এবং বেহেশতের নিয়ামতের বর্ননা, হাদিস নং -৬৯৩৯)

নিজের সকল কিছুর বিনিময়ে মাহবুবকে পেতে চেষ্টা করা, অন্তরের টান পয়দা করা, অন্তরে মাহবুবের স্মরণ থাকা। মাহবুবের নাম শুনলেই অন্তরের হাল পরিবর্তন হয়ে যাওয়া। সবসময় মাহবুবকে পাওয়ার একটা আকাংখা অন্তরে থাকা, এর নাম মুহাব্বাত এর নাম ভালবাসা।

৩.হুজুর নবিজির ﷺ বাহ্যিক সুন্নাহ অনুসরণ করা, নবিজির ﷺ আখলাক অনুসরণ করা, শরিয়তের তাবেদারি করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ۗ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ

বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর, যাতে আল্লাহ ও তোমাদিগকে ভালবাসেন এবং তোমাদিগকে তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেন। আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু।(3:31)

لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا
যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্যে রসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে।(33:21)

وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا ۚ

“রসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক”।(সূরা হাশর , আয়াত নং -৭)

আল্লাহর হাবিব ﷺ বলেন,
“যে আমার সুন্নাহ থেকে বিমুখ হয়ে যায় সে আমাদের দলভূক্ত হয়”।

“তোমাদের কাছে দুটো জিনিস রেখে যাচ্ছি যা আকড়ে ধরলে তোমরা পথ ভ্রষ্ট হবেনা। আল্লাহর কিতাব কুরআন ও তার রাসুলের সুম্মাত”।

“তোমাদের জন্য আমার সুন্নাহ ও আমার পরবর্তী খুলাফায়ে রাশিদিনের সুন্নাহ মানা আবশ্যক”।

কাজেই হুজুর রাসুলুল্লাহর ﷺ পরিপূর্ণ অনুসরণ ছাড়া আমরা আল্লাহর প্রিয়বান্দা হতে পারব না। আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে হলে হুজুর রাসুলুল্লাহর ﷺ সুন্নাহ, আমল ও আখলাক আমাদেরকে অনুসরণ করতেই হবে।
৪.সর্বেশেষ, Last but not least, প্রিয় নবিজির ﷺ উম্মতের তথা আল্লাহর সৃষ্টির সেবায় নিয়োজিত থাকা। সৃষ্টির প্রতি ভালবাসা মায়া-দয়া এবং করুণা করা নবিজির ﷺ অন্যতম প্রধান গুন ছিল। প্রিয় নবিজিﷺ সেই উম্মতকে ভালবাসেন, যে আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি দয়া দেখায়। আল্লাহর সৃষ্টি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানব, পশুপাখি, কীটপতঙ্গ, তরুলতা গাছপালা সকল কিছুর প্রতি দয়া প্রদর্শন করতে হবে।

আল্লাহর হাবিব ﷺ বলতেন, “দুনিয়াতে যারা আছে তাদের ওপরে দয়া কর, আকাশের অধিপতি তোমাদের ওপর দয়া করবেন।”

বনি ইসরাইলের এক পতিতা কিভাবে জান্নাতের গ্যারান্টি পেয়েছিল তা আমরা সবাই জানি কমবেশি। বুখারি শরিফের সহিহ হাদিস, একটা তৃষ্ণার্ত মৃত্য পথযাত্রী কুকুরকে জুতাতে ফিতা বেঁধে কুয়া থেকে পানি তুলে পান করানোর কারনে আল্লাহ পাক ঐ দুশ্চরিত্রা পতিতাকে কাল হাশরের দিনে ক্ষমা করে দেবেন। আর একটা বিড়ালকে বেঁধে রেখে পানি ও খাবার না দিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়ার কারণে আল্লাহপাক এক নেককার মানুষকে জাহান্নামে দেবেন।

কীটপতংগের বাসায় প্রস্রাব পায়খানা করতে শক্ত মানা আছে হাদিস শরিফে।

মানষের ধর্ম-বর্ন নির্বিশেষে সেবা করতে হবে, তাদের বিপদে আপদে এগিয়ে যেতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَإِنْ أَحَدٌ مِّنَ الْمُشْرِكِينَ اسْتَجَارَكَ فَأَجِرْهُ حَتَّىٰ يَسْمَعَ كَلَامَ اللَّهِ ثُمَّ أَبْلِغْهُ مَأْمَنَهُ ۚ ذَٰلِكَ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَّا يَعْلَمُونَ
“আর মুশরিকদের কেউ যদি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তবে তাকে আশ্রয় দেবে, যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনতে পায়, অতঃপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌছে দেবে। এটি এজন্যে যে এরা জ্ঞান রাখে না”। (সূরা তওবা সূরা নং-৯: আয়াত নং-৬)

সূরা তওবা সর্বশেষ নাজিলকৃত আয়াত। এমনটা মনে করার কারণ নেই যে, এই আয়াতের নির্দেশ রহিত হয়ে গেছে। এই আয়াতের হুকুম কাল কেয়ামত পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকবে।
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,
لَّا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُم مِّن دِيَارِكُمْ أَن تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
ধর্মের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিস্কৃত করেনি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদেরকে ভালবাসেন। সূরা মুমতাহিনা, সূরা নং60: আয়াত নং-8

এই কাজগুলো যদি আমরা করতে পারি ইখলাসের সাথে তবে আমরা আশা করতে পারি আমরা স্বপ্নে হুজুর রাসুলুল্লাহর ﷺ দিদার পাব।

Leave a Reply

Close Menu